সপ্তাহের প্রতিদিনের ব্রত: গ্রহ, খাবার ও প্রবাদ
সপ্তাহের প্রতিটি দিনে একটি নির্দিষ্ট গ্রহের প্রভাব থাকে। পুরানো পঞ্জিকা আর দাদি-নানিদের মুখে শোনা এই ব্রতের তালিকাগুলো আপনার দৈনন্দিন জীবনে আনতে পারে শান্তি।
রবিবার: সূর্যের উদ্দীপনা ও লবণবিহীন খাবার
সপ্তাহের শুরুতে রবিবার, যখন সূর্যদেবের প্রভাব সবচেয়ে শক্তিশালী। একে 'আদিনার' বলা হয়। দাদি-নানিদের বলতে শোনা যায়, এই দিনে উচ্ছ্বসিত মন নিয়ে দিন শুরু করলে সপ্তাহজুড়ে মন খুলে থাকে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর পূর্বদিকে মুখ করে একটুক্ষণ ধ্যান করলে শরীরে জীবনবাহিনী চলে আসে।
রবিবারের প্রধান নিয়ম হলো লবণবিহীন খাবার খাওয়া। অনেক পৈত্রিক পরিবারে এই দিনে বিস্কট, ডাল বা ভাতের সাথে লবণ দেওয়া কেবল মুখের সাথে নিষিদ্ধ। লবণের স্থানে চিনি বা গুড় ব্যবহার করা হয়। এছাড়া গাঢ় কমলা বা হলুদ রঙের ফল খাওয়া ভালো বলে মনে করা হয়, যেমন লেবু বা কমলা।
সূর্যদেবের ক্রোধ দূর করার জন্য এই সহজ নিয়মগুলো মানা হয়। এটি কোনো কঠোর নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং মনের সমন্বয়ের একটি উপায়। কাহিনীতে বলা হয়, সূর্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানালে চোখের সমস্যা বা অহংকার দূর হয়। আপনি চাইলে সকালে একটু জল পান করে পূর্বদিকে প্রণাম করতে পারেন, এতে মন হালকা লাগে।
- লবণবিহীন ভাত বা ডাল
- কমলা রঙের ফল
- গুড় বা চিনি
- সকালে পূর্বদিকে প্রণাম
সোমবার: চাঁদের শান্তি ও শিবের ভক্তি
সোমবারই চাঁদের দিন, যাকে 'সোমবার' বলা হয়। এই দিনে চাঁদের প্রভবে মানুষের মন বেশি সংবেদনশীল ও ভাবুক হয়ে ওঠে। অনেকের কথাবার্তা তীব্র হয়ে যেতে পারে, তাই এই দিনে মানসিক শান্তি বজায় রাখা জরুরি। প্রাচীন জ্যোতিষীরা বলতেন, সোমবারের চাঁদ মানুষের প্রাণে ঠান্ডা নেমে আসে।
সোমবারের ব্রতের সাথে শিবতন্ত্রের গভীর সম্পর্ক আছে। নিরাম্লেক্ষ বা নীলকণ্ঠ শিব দেবের কল্পনা করে এই দিনের উপবাস পালন করা হয়। খাবার হিসেবে সবুজ শাকসবজি, মিলেট বা ভাতে ভাপানো চাল, এবং খেজুর খাওয়া ভালো। অনেক পরিবারে এই দিনে শুধুই খেজুর আর জল খেয়ে দিন কাটাতে বসেন।
সোমবারের চাঁদ দেখা একটি বড় আচার। বাড়ির বড়রা বলতেন, এই দিনে চাঁদ দেখলে বর্ষব্যাপী শান্তি থাকে। শিব মন্দিরে গিয়ে জল অর্চনা করা বা বাড়িতে একটি ছোট শিবলিঙ্গ স্থাপন করে পূজা করা হয়। এছাড়া সোমবারের রাতে দীপ নিক্ষেপ করলে বাহ্যিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের চেয়ে আধ্যাত্মিক আনন্দ বেশি পাওয়া যায়।
- সবুজ শাকসবজি
- খেজুর
- মিলেট বা ভাত
- চাঁদ দেখা এবং জল অর্চনা
মঙ্গলবার: যুদ্ধের গ্রহ শান্ত করার কৌশল
মঙ্গলবার মঙ্গল গ্রহের দিন, যাকে যুদ্ধের গ্রহ বলা হয়। এই গ্রহের প্রভাব রক্ত এবং শরীরের শক্তি ও গতিগতির সাথে যুক্ত। অনেকের ক্ষেত্রে এই দিনে রাগ রসাতলে নেমে যেতে পারে বা শরীরে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। এই দিনে উত্তেজিত কথা বলা থেকে বিরত থাকা জরুরি বলে মনে করা হয়।
মঙ্গলবার বলরাম বা রামচন্দ্রের ভক্তিতেও পাওয়া যায়। অনেক গ্রামে এই দিনে লাল রঙের ফল, যেমন লাল টমেটো বা লাল আপেল খাওয়া হয়। লাল রঙ মঙ্গলের সাথে যুক্ত বলে মনে করা হয়। কাঁচা গুড় বা খেজুরের রস খেলে মঙ্গলের ক্রোধ দূর হয় বলে বিশ্বাস।
মঙ্গল গ্রহের শান্তি পেতে বাড়ির লাল পতাকা বা লাল রঙের কাপড় পরা হয়। কিছু পরিবারে এই দিনে লাল মরিচ বা লাল মসলা ব্যবহার করা এড়ানো হয়। মঙ্গলবারের সন্ধ্যায় দক্ষিণ দিকে মুখ করে প্রণাম করা একটি প্রচলিত সংস্কৃতি। এতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং ভীতি দূর হয়।
- লাল রঙের ফল
- কাঁচা গুড়
- লাল কাপড় পরা
- দক্ষিণ দিকে প্রণাম
আপনার জন্মগ্রহের বিবরণ দিয়ে মহাদশা দেখে নিন এবং পরিবারের জন্য উপযুক্ত মুহূর্ত নির্ধারণ করুন।
বুধবার: বুদ্ধির খেলা ও সবুজের প্রভাব
বুধবার বুধ গ্রহের দিন, যেখানে বুদ্ধি, কথাবার্তা এবং বাণিজ্যের প্রভাব সবচেয়ে বেশি থাকে। এই গ্রহের প্রভাবে মানুষের ভাষা তীক্ষ্ণ ও দ্রুত হয়ে ওঠে। অফিস বা ব্যবসার কাজে এই দিন বেশি সম্মানের যোগ্য বলে মনে করা হয়। তবে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে সাবধান থাকতে হয়।
বুধবারের খাবারে সবুজ রঙের উপাদান গুরুত্বপূর্ণ। সবুজ শাক, সবুজ মসলা এবং সবুজ রঙের ফল খাওয়া ভালো। কিছু বিদ্যমান পদ্ধতিতে এই দিনে নীল বা সবুজ রঙের কাপড় পরা হয়। বুধ গ্রহের মনোবোলানোর জন্য মিষ্টি খাওয়া এবং বুদ্ধিমানের সাথে আলাপ করা ভালো ফল দেয়।
বুধবারে পুস্তক পাঠ করা বা নতুন কিছু শেখা শুরু করা উত্তম। এই গ্রহ শব্দ ও বাক্যের সঙ্গে যুক্ত, তাই গুডবাই বা শান্তি বার্তা পাঠালে মন ভালো থাকে। অনেকরা এই দিনে সাদা বা সবুজ রঙের ফুল দিয়ে দেবতাদের পূজা করেন। এতে মনের গোলমাল দূর হয় এবং কাজে যত্নশীলতা বাড়ে।
- সবুজ শাকসবজি
- সবুজ ফল
- সাদা বা সবুজ কাপড়
- নতুন কাজের উদ্যোগ
বৃহস্পতিবার: গুণের গর্ব ও হলুদ খাবারের রহস্য
বৃহস্পতিবার বৃহস্পতি গ্রহের দিন, যাকে বৃহস্পতি বা গুরু বলা হয়। এই গ্রহ দৈন্য, জ্ঞান এবং ধর্মের প্রতীক। এই দিনের প্রভাবে মানুষের ভেতরে মহৎ গুণের সঞ্চার হয়। অনেকের মনে এদিন আনন্দ আর উৎসবের আভাস থাকে। পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
বৃহস্পতিবারের প্রধান খাবার হলো হলুদ রঙের। হলুদ ডাল, হলুদ মুড়ি, বা হলুদ ফল খাওয়া বৃহস্পতি গ্রহের খুশি আনে। অনেক বাঙালি পরিবারে এই দিনে হলুদ জামা পরা হয়। বৃহস্পতি গ্রহের কথায় বলা হয়, গুণই একমাত্র সম্পদ, তাই এই দিনে অন্যের প্রশংসা করা ভালো ফল দেয়।
বৃহস্পতিবারে ব্রহ্মা বা গণেশ দেবের পূজা করা হয়। গণেশ দেব বুদ্ধির প্রতীক, তাই এই দিনে তাঁর আরাধনা করে জীবনের অসুবিধা দূর করার চেষ্টা করা হয়। অনেকরা এই দিনে পুরানো বই পড়ে নতুন জ্ঞান অর্জন করেন। গৃহস্থলির নিয়ম মেনে চললে বৃহস্পতি গ্রহের প্রভাব ইতিবাচক থাকে।
- হলুদ ডাল বা মুড়ি
- হলুদ ফল
- হলুদ জামা
- ব্রহ্মা বা গণেশ পূজা
শুক্রবার: প্রেমের গ্রহ ও শান্তির খাবার
শুক্রবার শুক্র গ্রহের দিন, যাকে শুক্র বা ভুসু বলা হয়। এই গ্রহ প্রেম, সৌন্দর্য, কলাকুশল এবং আনন্দের প্রতীক। এই দিনের প্রভাবে মানুষের মন বেশি কোমল ও ভালোবাসায় ভরে ওঠে। দম্পতির মধ্যে ভালো বোঝাপড়া তৈরি হয়। পরিবারের মধ্যে মিষ্টি আলাপ বেশি শোনা যায়।
শুক্রবারে শাঁইয়ের খাবার খাওয়া উত্তম। শাঁই, ভুনা আটা, বা মধু খাওয়া শুক্র গ্রহের খুশি আনে। কিছু বাড়িতে এই দিনে স্যান্টি মাতার পূজা করা হয়। শুক্র গ্রহের ক্রোধ দূর করার জন্য এই দিনে নীল বা লাল রঙের কাপড় পরিহার করা হয়। বরং সাদা বা গোলাপী রঙের কাপড় পরা ভালো।
শুক্রবারে গান বা নাচের আমেজ বাড়িতে বাড়ে। অনেকরা এই দিনে নতুন গয়না পরেন বা ঘড়ি কেনেন। কিন্তু নতুন কিছু কেনার সময় সাবধান থাকতে হয়, কারণ শুক্র গ্রহের প্রভাবে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। গৃহস্থলির নিয়ম মেনে চললে শুক্র গ্রহের প্রভাব ভালো থাকে এবং মনে শান্তি থেকে থাকে।
- শাঁইয়ের খাবার
- মধু
- সাদা বা গোলাপী কাপড়
- স্যান্টি মাতার পূজা
শুক্রবারের নিষেধাজ্ঞা ও প্রচলিত বিশ্বাস
শুক্রবারে অম্ল বা খাঁচার খাবার খাওয়া উচিত নয় বলে অনেক পুরানো নিয়মে বলা হয়। মিষ্টি খাওয়া এই গ্রহের প্রিয়। এই দিনে নতুন ঝগড়া বা বিবাদ করা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
কিছু বিশ্বাস অনুযায়ী, শুক্রবারে নতুন শয্যা কেনা বা বিছানা মেলা উচিত নয়। তবে গয়না পরা বা নতুন কাপড় পরা বৈধ। এই দিনের আচার অনুসরণ করে মানুষ মনের মতো খোঁজে।
শনিবার: শনিদেবের কঠোরতা ও কালো খাবারের গুরুত্ব
শনিবার শনি গ্রহের দিন, যাকে শনি বা শনিদেব বলা হয়। এই গ্রহ কষ্ট, শৃঙ্খলা এবং কর্মের ফলের প্রতীক। এই দিনের প্রভাবে মানুষের মনে এক ধরনের সুরূপ বা গভীর ভাবনা জাগে। অনেকের ক্ষেত্রে এই দিনে শরীরে ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। শনি গ্রহের শান্তি পেতে বিশেষ সাবধানতা জরুরি।
শনিবারের খাবারে কালো রঙের উপাদান গুরুত্বপূর্ণ। কালো তিল, কালো মসুরি, বা কালো গুড় খাওয়া শনি গ্রহের খুশি আনে। অনেক পরিবারে এই দিনে শুধুই জল খাওয়া হয় বা একবার খাওয়া হয়। শনিবারে নীল বা কালো রঙের কাপড় পরা ভালো বলে মনে করা হয়।
শনিবারে বাবা বা বয়স্কদের সম্মান করা শনি গ্রহের শান্তি আনে। প্রাচীন জ্যোতিষীরা বলতেন, শনি গ্রহ আমলের গ্রহ, তাই এই দিনে আম খাওয়া উচিত নয়। বরং কালো তিল দিয়ে তৈরি মসলা খাওয়া ভালো। নিয়মিত এই চিন্তা করলে শনি গ্রহের কঠোর প্রভাব থেকে বাঁচা যায়।
- কালো তিল
- কালো মসুরি
- নীল বা কালো কাপড়
- বয়স্কদের সম্মান
শনিবারের বিশেষ নিষেধাজ্ঞা
শনিবারে নতুন জুতা বা মোজা পরা উচিত নয় বলে অনেক পুরানো নিয়মে বলা হয়। নতুন কিছু কেনার সময় সাবধান থাকতে হয়।
এছাড়া শনিবারে আম খাওয়া বা আমের গাছের নিচে বসা থেকে বিরত থাকা ভালো। শনি গ্রহের শান্তি পেতে এই ছোট ছোট নিয়মগুলো মানা হয়।
সাধারণ প্রশ্ন
রবিবার লবণ খেলে কি সমস্যা হয়?
জ্যোতিষ শাস্ত্রে লবণের সাথে সূর্যের সম্পর্ক বলে মনে করা হয়। তাই এই দিনে লবণবিহীন খাবার খেলে সূর্যদেবের ক্রোধ দূর হয় বলে বিশ্বাস। তবে অসহ্য ক্ষেত্রে সামান্য পরিমাণ খাওয়া যায়।
সোমবার শুধু খেজুর খাওয়া যাবে?
হ্যাঁ, সোমবারের ব্রতে একবার খেজুর খেয়ে দিন কাটানো একটি প্রচলিত নিয়ম। এতে মন শান্ত থাকে এবং শিবদেবের আশীর্বাদ পাওয়া যায় বলে মনে করা হয়। অনেক পুরোহিত এই পদ্ধতিকে দক্ষতা বলে জানায়।
বৃহস্পতিবার হলুদ জামা নেই, কি পরা যাবে?
হলুদ জামা না থাকলে হলুদ চপ্লা বা রুমাল পরা যায়। হলুদ রঙের খাবার খাওয়া এবং গৃহস্থলির পৌঁছা পরা এই দিনের প্রধান আচার। রঙের অভাবে মনোযোগ খাবারের দিকে দিতে হয়।
শুক্রবারে নতুন গয়না পরা ভালো কি?
হ্যাঁ, শুক্রবারে নতুন গয়না পরা এই গ্রহের খুশি আনে। তবে নতুন ঝগড়া বা বিবাদ করা থেকে বিরত থাকতে হয়। গয়না পরার সময় মনের ভিতরে ভালোবাসার কথা ভাবলে ভালো ফল হয়।
শনিবার কালো তিল কিভাবে খাব?
কালো তিল দিয়ে ভাজা বা মিষ্টি খাওয়া এই দিনে উপকারী। গুড়ের সাথে কালো তিল মেখে খাওয়া একটি সরল পদ্ধতি। এছাড়া কালো মসুরি দিয়ে ডাল বানিয়েও খাওয়া যায়।
মন্তব্য
প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।